আমার শৈশব

আর পাঁচটা গ্রামের ছেলের শৈশব কাটে মাঠে ঘাটে ক্রিকেট, ফুটবল খেলে কিংবা পুকুরে সাতার কেটে অথবা মায়ের বকুনি খেয়েও বন্ধুদের সাথে সারাদিন ঘুরেফিরে। 

ছোটবেলায় আমায় সবাই ডাকতো 'শাপলার' ডাক্তার। কেনো? তাহলে শুনোন, ছোট বেলায় আমার খুব ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার। আমাদের বাড়ির পাশেই ইছামতী নদীর একটা ছোট্ট শাখা বয়ে গেছে। সেখান থেকে শাপলা এনে দুই ভাগ করে কানে লাগিয়ে সেটা দিয়ে সবার চিকিৎসা করতাম। তাই সবাই আমাকে শাপলার ডাক্তার বলে ডাকত।

আমার নাম শেখ সোহান আহমেদ, আমার বাড়ি ঢাকা জেলার দোহার থানায়। দক্ষিন চর জয়পাড়ায় দুই বোন, বাবা- মা কে নিয়ে আমাদের ছোট্ট বাড়িতে বসবাস। জন্মের পর থেকে স্কুলের বন্ধুদের সাথে নই খেলাতাম বান্ধবিদের সাথে কুতকুত, কানামাছি। মানে যে খেলাগুলো মেয়েরা খেলে আর কি। তাই বলে ভাবিয়েন না আমার স্বভাব মেয়েদের মত। তবে মেয়েদের সাথে খেলেছি বলেই হয়ত ক্রিকেট ফুটবলের প্রতি কখনও আগ্রহ তৈরি হয়নি। এটা ছিল একেবারে ছোটবেলা মানে যখন ক্লাস ওয়ান অথবা টু তে পড়তাম।  তারপর আর খেলিনি। মায়ের বাধ্য ছেলে ছিলাম সারাদিন পড়া নিয়ে ব্যাস্ত আর ফাঁকি দিয়ে দোকান থেকে দুই টাকা আর পাঁচ টাকার চানাচুর, চকলেট, বিস্কুট ইত্যাদি কিনে খাওয়া। প্রতি মাসে আমাদের বাসার পাশের আনিস কাকার দোকান থেকে লম্বা একটা লিস্ট মায়ের হাতে ধরিয়ে দিত। যাতে লেখা থাকত। সোহান, দুই টাকা চানাচুর। পাচ টাকা আচার, দুই টাকা চকলেট এই রকম। সত্যি বলতে এইসবের থেকেও বেশি যেটা ভালো লাগতো সেটা হচ্ছে মায়ের রান্না ঘরে বসে মাদুলে বই নিয়ে বসে থাকা। মা পড়াতো আর রান্না করত। আর আমি পড়তাম। তখন মা পড়াতো বলেই হয়তো বৃত্তিটা পেয়েছিলাম। সব স্মৃতিতেই ভালোর সাথে খারাপও কিছু স্মৃতি থাকে। সেটা হল আমার একটা শিক্ষক ছিল যার নাম আমি বলতে চাই না কারন। শিক্ষক যেমনই হোক তিনি আমার গুরু। কিন্তু ঘটনাটা শেয়ার করতে চাই। উনি আমাকে পড়াত আমাদের বাসায় এসে। আমার বরাবর বানানে একটু অসুবিধা ছিল তাই উনি আমাকে খুব মারত। আর সব সময় বলত আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি যে তুমি কখনই বৃত্তি পাবা না। এই কথা শুনে মা খুব রেগে গেল আর আমাকে স্যারের কাছে আর পড়ালো না। মা জেদ ধরে বসলো বৃত্তি আমাকে পেতেই হবে। মা সারাদিন কাজ করত আর আমাকে পাশে বসিয়ে পড়াতো। মায়ের স্বপ্ন সব সময় সত্যি হয় তাই এই স্বপ্নটাও বৃথা যায়নি। 

ছোট বেলা থেকে আমার বড় বোনেরা আমায় খুব আদর করত। কিন্তু আমি কিন্তু উদের খুব জ্বালাতাম। উদের প্রয়োজনে কিছু তো এনে দিতামই না বরং কিছু আনতে দিলে বকশিস নিতাম পন্যর দামনুযায়ী। আমার ছোট বোন জিনিয়া ওর মুখে যত দাম আছে সব আমার হাতের চিমটি। এত অত্যাচারের পরও বোনেদের আগলে রাখা ভালোবাসা শৈশবের স্মৃতিকে আরও আবেগময় করে তুলে। আমার শৈশব ছিল খুব সাধারন। হয় তো সাধারনের চেয়েও বেশি সাধারণ। তবুও এই শৈশবই ছিল আমার জীবনের সব থেকে ভালো সময়। যদি পারতাম টাইম মেশিন দিয়ে পুনারায় শৈশবে ফিরে যেতাম।

Comments

Popular posts from this blog

পরিচয়

ভ্রমন কাহিনী